৫ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ উন্মোচন
খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইনি জটিলতা ও আইনি প্রভাব পর্যালোচনা সাপেক্ষে সাধারণ ঋণখেলাপি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করার পরিকল্পনাও করেছে দেশের ব্যাংকখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের আরও মনোযোগী ও উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা দেওয়ার নীতিমালা করা হবে। দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করে প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন ও হালনাগাদ করা হবে।
দেশের সংকটগ্রস্ত ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ৫ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সংকটের মুলে রয়েছে বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণ । বর্তমানে বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬.০৬ লাখ কোটি টাকায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপিত ১৩ দফার সংস্কার পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ (এনপিএল) নিয়ন্ত্রণ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে একক গ্রাহকের ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, বিশাল প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি, পুঞ্জীভূত লোকসান এবং দুর্বল ঋণ আদায় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার কৌশলও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ
যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে পর্যালোচনামূলক বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিটি সভায় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে আদায়ের অগ্রগতিও আদায়ের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে তদারকি করা হবে।
এ ছাড়া উচ্চ খেলাপি ঋণগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ আদায় কৌশল সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা (গাইডলাইন) জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকাও হালনাগাদ করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যেই এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ
আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (আইএফআরএস)-এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে ‘প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি’ (এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস) ভিত্তিক খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আইনি জটিলতা ও আইনি প্রভাব পর্যালোচনা সাপেক্ষে, সাধারণ ঋণখেলাপি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করার পরিকল্পনাও করেছে দেশের ব্যাংকখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের আরও মনোযোগী ও উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা দেওয়ার নীতিমালা করা হবে। পাশাপাশি দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করে প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন ও হালনাগাদ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ
একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে সর্বোচ্চ কত ঋণ নিতে পারবেন, তার একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার কিছু ব্যবস্থা সাধারণ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায় কি না, সেজন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। খেলাপি ঋণগ্রহীতারা যাতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারেন, সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ ছাড়া ১,০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিবর্তে প্রয়োজনে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারি খাতে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তাও দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ
প্রতিবেদনে জানানো হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যেই ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি (রিস্ক-বেজড সুপারভিশন) ব্যবস্থা চালু করেছে। এই ব্যবস্থার অধীনে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থার মূল্যায়ন করে একটি সামগ্রিক (কম্পোজিট) রিস্ক রেটিং করা হবে, এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর বাইরে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬’, অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধন এবং ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন প্রতিস্থাপন করে ‘ইনসলভেনসি এন্ড ব্যাংক্রাপসি আইন’ প্রণয়নের কাজ চলছে। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনেও সংশোধনের কাজ এগিয়ে চলছে।
ব্যাংকিং খাতে চরম আর্থিক চাপ
অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপন করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা—যা বিতরণকৃত মোট বকেয়া ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ।
নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ৪,৮৩,৩৯৭ কোটি টাকার প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার কথা ছিল। তবে তারা সংস্থান করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা; ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায়।
গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৮৯ কোটি টাকা, যার বিপরীতে নিট লোকসান হয়েছে ৮,৪১৭ কোটি টাকা। আর রিটার্ন অন অ্যাসেটস (আরওএ) এবং রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ঋণাত্মক ১.০৩ শতাংশ এবং ঋণাত্মক ৪৪.২২ শতাংশে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ, যা চলতি বছরের মার্চে আরও কমে ঋণাত্মক ৩.১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি ব্যাসেল-৩ মানদণ্ডের সর্বনিম্ন ১২.৫ শতাংশের চেয়ে অনেক নিচে।
দেশের মাত্র ৪০টি ব্যাংক সর্বনিম্ন মূলধন শর্ত পূরণ করতে পেরেছে, অন্যদিকে ১৫টি ব্যাংক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক—তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৪.৭৭ শতাংশে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবেদনে বলেছে, মূলধনের এই দূর্বলতা ব্যাংকগুলোর লোকসান শোষণক্ষমতা, আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন ঋণ সম্প্রসারণের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, যেসব ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক বা ন্যুনতম প্রয়োজনীয় মূলধনের নিচে রয়েছে, সেসব ব্যাংকের মূলধন পুনর্ঠন ও পুনঃমূলধনীকরণ প্রয়োজন।
পুঞ্জিভূত লোকসান ২.৫৪ লাখ কোটি টাকা
সংসদীয় কমিটিতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকায়। বিপুল খেলাপি ঋণ, তার বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল সম্পদ মানের কারণে এই লোকসান হচ্ছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এসব কারণে ব্যাংকগুলোর পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ক্রেডিট লস সমন্বয়ের পর—অনেক ব্যাংক নিট ক্ষতিতে পড়ছে।
লোকসানি ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানও লোকসানে চলছে।
৮৪,৯৪৬ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংকটে থাকা ১২টি ব্যাংককে মোট ৮৪ হাজার ৯৪৫.৭১ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এ ছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৫ হাজার ৮১০.৩২ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০.২৫ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪২.৭৯ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮.৩৫ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে।
সর্বশেষ ঋণদাতা বা ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে এই সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকগুলো এই ঋণ পরিশোধ করছে না, শুধুমাত্র সুদ পরিশোধ করছে। আর তারল্য সহায়তার মূল টাকা ডিমান্ড লোন হিসেবে রোল ওভার বা নবায়ন করা হচ্ছে।
সামগ্রিক তারল্য ঘাটতি নেই
নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংক সংকটে থাকলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার সম্পদ রাখার কথা থাকলেও—বাস্তবে ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে ৭ লাখ ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটি প্রমাণ করে যে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই।
সংসদীয় কমিটি আর্থিক খাতের এই সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
