রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির ঘোষণা দিলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড
গুঞ্জনের অবসান ঘটেয়ে অবশেষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশে তাদের 'ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং' (ডব্লিউআরবি) ব্যবসা বিক্রির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভাবনা যাচাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। নিজেদের যেসব ব্যবসায়িক খাতে বড় পরিসরে বৈশ্বিক প্রভাব ফেলার সুযোগ রয়েছে, কেবল সেসব খাতেই মূলধন ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার বৈশ্বিক কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রায় ১২০ বছর ধরে গ্রাহক সেবা দিয়ে আসা ব্যাংকটি জানিয়েছে, তারা তাদের 'কর্পোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং' (সিআইবি) ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে এ দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সার্বিক প্রবৃদ্ধির হাত ধরে এই করপোরেট শাখাটিও উপকৃত হয়ে আসছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানিয়েছে, এই ঘোষণার ফলে ব্যাংকটির ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রভাব পড়বে না। সম্ভাব্য হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটি যথারীতি তাদের খুচরা ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক লেনদেনকারী ও উচ্চ-আয়ের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়ার যে কৌশলগত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক এই ব্যাংক গোষ্ঠীটি নিয়েছিল, প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপটি তারই অংশ। ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশকালে এবং ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ইনভেস্টর ইভেন্টে ব্যাংকটি এই বৈশ্বিক কৌশলের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিল।
তবে সম্ভাব্য যেকোনো লেনদেন বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (রেগুলেটরি) অনুমোদনের সাপেক্ষে সম্পন্ন হবে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এনামুল হক বলেন, "বাংলাদেশে আমাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারকে আমরা আরও সুনির্দিষ্ট করছি, যাতে আমাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে- বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূলধন প্রবাহ এবং অবকাঠামোগত অর্থায়নের ক্ষেত্রে।।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের জন্য বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবেই বহাল রয়েছে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে- আমাদের প্রতিশ্রুতি আগের মতোই সুদৃঢ় রয়েছে।"
এনামুল হক জানান, চুক্তি প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা হস্তান্তরের এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে আনুমানিক ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, "এ সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে গ্রাহক সেবাই থাকবে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমাদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং গ্রাহকদের যেন সামান্যতম অসুবিধা না হয়, তা নিশ্চিত করতে আমরা তাদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাব।"
ব্যাংকটি আরও জানিয়েছে, এই হস্তান্তরের ফলে প্রভাবিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং পেশাদারিত্বের সাথে সহায়তা করতে তারা প্রতিশ্রুতবদ্ধ। একই সাথে চুক্তি প্রক্রিয়াজুড়ে কর্মীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা ব্যাংকটির অন্যতম প্রধান বিবেচনা হিসেবে থাকবে।
ব্যাংকিং খাতের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা কিনে নিতে দেশের ছয়টি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সম্ভাব্য এসব ক্রেতা ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পুবালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠিত গ্রাহকভিত্তি, উচ্চ-আয়ের গ্রাহকশ্রেণি, বিপুল আমানত, শক্ত ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা এবং অন্যান্য রিটেইল ব্যাংকিং সম্পদের কারণে- স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ফ্র্যাঞ্চাইজিটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, ব্যবসা বিক্রির এই প্রস্তাবটি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।
তারা জানান, প্রস্তাবিত হস্তান্তরের পর নিজেদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও কর্মসংস্থানের কী হবে- তা নিয়ে কর্মীরা চিন্তিত; কারণ রিটেইল শাখার এই জনবলকে বিক্রয় চুক্তির অধীনে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে ব্যাংকটি এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি।
অবশ্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, পুরো লেনদেন প্রক্রিয়াজুড়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা ব্যাংকটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে।
-কেআর
