স্মৃতির ক্যানভাসে চিরভাস্বর বিদায়ী জাদুকর: মেসি'র স্মরণীয় ১০ মুহূর্ত
আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিখ্যাত আকাশী-নীল জার্সিতে আর দেখা যাবে না সেই চেনা জাদুকরী লিওনেল মেসিকে। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানিয়েছেন ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা মহানায়ক লিওনেল মেসি। ২০০৫ সালে এক কিশোর হিসেবে যে আন্তর্জাতিক ফুটবল যাত্রার শুরু হয়েছিলো, ২ দশক পর তার সমাপ্তি ঘটলো বিশ্বকাপজয়ী এক কিংবদন্তি হিসেবে। বিদায়ের এই সিদ্ধান্তটি তাঁর নিজের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিলো, কিন্তু মেসি মনে করেন সরে দাঁড়ানোর উপযুক্ত সময় এখনই। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারের ঠিক ২ দিন পর, অর্থাৎ ২১ জুলাই তিনি তাঁর অবসরের চূড়ান্ত বিবৃতিটি লিখে ফেলেছিলেন। কিন্তু বাবার গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করতে কিছুটা বিলম্ব করেন।
মেসি'র আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সবসময় রূপকথার মতো মসৃণ ছিলো না। এর মধ্যে ছিলো একের পর এক ফাইনাল হারের বুকভাঙা কষ্ট, তীব্র সমালোচনা এবং ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সাময়িক অবসরের ঘোষণা। তবে ক্যারিয়ারের শেষভাগের অবিশ্বাস্য অর্জনগুলো তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে অমরত্ব দিয়েছে। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা শিরোপা জয় মেসি'র বর্ণিল ক্যারিয়ারের সব আক্ষেপ দূর করে দেয়।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসি'র এই প্রস্থানে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয়ে জমেছে একরাশ ‘আনফরগটেবল মেমোরিজ’। তাঁর ২ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ার থেকে বেছে নেওয়া ১০টি ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত নিচে তুলে ধরা হলো, যা চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের মনে অমলিন থাকবে:
১. জার্মানির মঞ্চে ১৮ বছরের কিশোরের রাজকীয় অভিষেক
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পা রাখেন মেসি। সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচটিতে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে তিনি হার্নান ক্রেসপোকে একটি গোল করতে সহায়তা করেন। পরবর্তীতে নিজে একটি গোল করে দলের ৬-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন। সেই সময়ে তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলোয়াড় এবং গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
২. ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে সেই আবেগঘন পথচলা
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ ও ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে খেলার সুযোগ পান মেসি। বার্সেলোনায় দুর্দান্ত পারফর্ম করে বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে আফ্রিকায় পা রাখলেও, সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানি'র কাছে বড় ব্যবধানে হেরে আর্জেন্টিনা'র বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়। তবে এই টুর্নামেন্টটি আর্জেন্টিনা'র ফুটবলের মূল কাণ্ডারি হিসেবে মেসি'র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটি অবিস্মরণীয় স্মৃতি ছিলো।
৩. বার্সার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট
২০১২ সালের ২০ মার্চ গ্রানাডা'র বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে সেসার রদ্রিগেজকে ছাড়িয়ে বার্সেলোনা'র সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন মেসি। ম্যাচের প্রথম গোলটি দিয়ে তিনি রদ্রিগেজের ২৩২ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন, দ্বিতীয় গোলটিতে রেকর্ড ভাঙেন এবং তৃতীয় গোল দিয়ে রেকর্ড আরও বাড়িয়ে নেন। পরবর্তীতে ৬৬২টি গোল নিয়ে তিনি বার্সেলোনা ছাড়েন, যা ক্লাবটিতে তাঁর অবিশ্বাস্য প্রভাবের স্বাক্ষর বহন করে।
৪. এক ক্যালেন্ডার বছরে রেকর্ড ৯১ গোল
২০১২ সালে বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য গোলবন্যার বছর পার করেন মেসি। সে বছর বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনা'র হয়ে তিনি মোট ৯১টি গোল করেন, যার মধ্যে ক্লাবের হয়ে ৭৯টি এবং জাতীয় দলের হয়ে ছিলো ১২টি গোল। এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি জার্ড মুলারের এক বছরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে দেন এবং টানা চতুর্থবারের মতো ব্যালন ডি’অর জয় করেন।
৫. লা লিগা'র সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভাঙার গৌরব
২০১৪ সালের নভেম্বরে সেভিয়া'র বিপক্ষে আরেকটি হ্যাটট্রিক করে লা লিগা'র ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন মেসি। তিনি তেলমো জারা'র ২৫১ গোলের রেকর্ডটি ভাঙেন, যা ১৯৫৫ সাল থেকে অক্ষুণ্ণ ছিলো। লা লিগায় মেসি'র ক্যারিয়ার শেষ হয় ৪৭৪ গোল নিয়ে, যা রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো'র করা ৩১১ গোলের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
৬. মারাকানায় শিরোপা আক্ষেপ মোচনের কান্না
মেসি'র আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিলো আর্জেন্টিনা'র হয়ে কোনো বড় শিরোপা জিততে না পারা। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা'র ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেই আক্ষেপ ঘোচে। জয়সূচক গোলটি করেছিলেন ডি মারিয়া। পুরো টুর্মেমেন্টে ৪ গোল করে মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মেসির হাঁটু গেঁড়ে মাঠে বসে পড়া এবং সতীর্থদের তাঁকে জড়িয়ে উল্লাসের দৃশ্যটি বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হতাশা মুক্তির এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে।
৭. কাতারে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ জয় ও পূর্ণতা
এই একটি ট্রফি মেসি'র ক্যারিয়ারকে সম্পূর্ণ করেছে। ২০২২ সালের শ্বাসরুদ্ধকর বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্রয়ের পর পেনাল্টি শুটআউটে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ফাইনালে মেসি ২টি গোল করেন এবং পেনাল্টি শুটআউটে দলের প্রথম শটটি সফলভাবে জালে পাঠান। পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল করে তিনি বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। টুর্নামেন্টের প্রতিটি পর্বে (গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল) গোল করা বিশ্বের প্রথম খেলোয়াড় বনে যান। এই জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা'র দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটে।
৮. রেকর্ড অষ্টম ব্যালন ডি’অর অর্জন
কাতার বিশ্বকাপের অভূতপূর্ব সাফল্য মেসিকে আরেকটি ব্যক্তিগত মাইলফলক এনে দেয়। ২০২৩ সালে তিনি রেকর্ড অষ্টম বারের মতো ব্যালন ডি’অর লাভ করেন, যা অর্জনে মূলত তাঁর কাতার বিশ্বকাপের জাদুকরী পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলো। তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে এক সারিতে মিলিত হয়।
৯. বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে ক্ষণিকের আরোহণ
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে দারুণ পারফর্ম করেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। টুর্নামেন্টে ৮টি গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল সংখ্যা দাঁড়ায় ২১-এ, যা তাঁকে সাময়িকভাবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছিলো। তবে পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল নিয়ে মেসিকে ছাড়িয়ে যান।
১০. শেষ বিশ্বকাপ ও মহাকাব্যের আবেগঘন বিদায়
মেসি'র শেষ বিশ্বকাপটি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক অত্যন্ত আবেগময় সমাপ্তি টানে। ৩৯ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে যান, যেখানে অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হয় আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনালের দুই দিন পরই মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে মেসি'র বিকল্প কোনোদিন আসবে না। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি ফুটবল-পাগল এক দেশের প্রত্যাশার ভার নিজের কাঁধে বহন করেছেন, ফাইনাল হারের বুকভাঙ্গা কষ্ট সহ্য করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সব গৌরবময় ট্রফি দেশের হাতে তুলে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর মেসিকে দেখা যাবে না সত্য, তবে তাঁর রেখে যাওয়া এই অবিশ্বাস্য স্মৃতিগুলো চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান থাকবে।
