৬ বিশ্বকাপে মেসি'র বদলে যাওয়ার গল্প
সংগৃহীত ছবি
২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে ১৮ বছরের তরুণ হিসেবে যে মেসি'র অভিষেক, ২০ বছর পর ২০২৬ সালে ৩৯ বছর বয়সে সেই মেসিই খেলেছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এই দীর্ঘ সময়ে শুধু বয়সই বাড়েনি, বদলে গেছে তাঁর খেলার ধরন, মাঠে দায়িত্ব এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিও।
শুরুতে গতি ও ড্রিবলিং ছিলো মেসি'র সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সময়ের সঙ্গে শারীরিক গতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আরও বেশি প্লে-মেকার ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রক। ৬টি বিশ্বকাপ তাই একজন ফুটবলারের ধারাবাহিকভাবে নিজেকে বদলে নেওয়ারও গল্প।
জার্মানি ২০০৬
মাত্র ১৮ বছর বয়সে জার্মানি বিশ্বকাপে অভিষেক হয় মেসি'র। সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করেন এবং হার্নান ক্রেসপোকে দিয়ে একটি গোলও করান।
সেবার তিন ম্যাচে মোট ১২২ মিনিট খেলেছিলেন মেসি। গোল করেছিলেন একটি, অ্যাসিস্টও ছিলো একটি। তখন তাঁর মূল শক্তি ছিলো গতি ও ড্রিবলিং। ডান প্রান্ত থেকে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বক্সে ঢুকে পড়াই ছিলো তাঁর খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০
৪ বছর পর মেসি'র ওপর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কোচ ডিয়েগো ম্যারাডোনা তাঁকে আর্জেন্টিনা'র আক্রমণভাগের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নিয়ে আসেন। উইংয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঝমাঠে নেমে আক্রমণ তৈরি করতেন তিনি।
৫ ম্যাচের সবক'টিতে শুরু থেকে খেলে ৪৫০ মিনিট মাঠে ছিলেন মেসি। তবে কোনো গোল করতে পারেননি। জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে ৪-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
ব্রাজিল ২০১৪
২০১৪ বিশ্বকাপে মেসিকে আরও স্বাধীন ভূমিকায় দেখা যায়। কোচ আলেহান্দ্রো সাবেলা তাঁকে ডান প্রান্ত থেকে মাঝমাঠে এসে খেলার সুযোগ দেন। গ্রুপ পর্বে ৪ গোল করেন মেসি। শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ডি মারিয়াকে দিয়ে গোল করান।
৭ ম্যাচে ৬৯৩ মিনিট খেলে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত জার্মানি'র কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয় আর্জেন্টিনা। তবে মেসি জেতেন টুর্নামেন্ট-সেরার গোল্ডেন বল।
রাশিয়া ২০১৮
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে মেসি'র জন্য পরিস্থিতি ছিলো ভিন্ন। কোচ হোর্হে সাম্পাওলির কৌশলে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভূমিকায় খেলতে হয়। কখনো ফলস নাইন, কখনো মাঝমাঠে নেমে খেলা তৈরি করা, এভাবেই এগোয় তাঁর বিশ্বকাপ।
নাইজেরিয়া'র বিপক্ষে গোল করে আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোতে তুলতে ভূমিকা রাখেন মেসি। ফ্রান্সের বিপক্ষে করেন দু'টি অ্যাসিস্ট। তবে শেষ পর্যন্ত ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ৪ ম্যাচে ৩৬০ মিনিট খেলেন মেসি।
কাতার ২০২২
কাতার বিশ্বকাপে দেখা যায় আরও পরিণত মেসিকে। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে নিজের গতি ও শক্তি বাঁচিয়ে কখন আক্রমণে যেতে হবে, কখন খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে- সেটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
প্লে-মেকার, দ্বিতীয় স্ট্রাইকার, পাসদাতা ও সেট-পিস বিশেষজ্ঞ- বিভিন্ন ভূমিকায় তাঁকে দেখা যায়। পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করেন মেসি। শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল- ৪ নকআউট পর্বেই গোল করেন তিনি।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাহুয়েল মোলিনাকে দেওয়া তাঁর অ্যাসিস্ট এবং ক্রোয়েশিয়া'র বিপক্ষে সেমিফাইনালের পারফরম্যান্স ছিলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে করেন জোড়া গোল। টাইব্রেকারে জিতে অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন মেসি।
উত্তর আমেরিকা ২০২৬
ষষ্ঠ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী মেসির দায়িত্ব ছিলো আরও হিসেবি। প্রতি মুহূর্তে বলের সঙ্গে থাকার বদলে পজিশনিং, পাস, সেট-পিস এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে ম্যাচে প্রভাব রাখেন তিনি।
স্কালোনি'র অধীনে এই ভূমিকাতেই ৮ ম্যাচে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করেন মেসি। আলজেরিয়া'র বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। আর্জেন্টিনা আবারও ফাইনালে উঠলেও অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়।
ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শেষে মেসি'র নামের পাশে দাঁড়ায় ৩৪ ম্যাচ, ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট।
বদলে যাওয়া মেসি
শেষ ৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকালে মেসি'র বিবর্তন স্পষ্ট। ২০০৬ সালে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলো গতি ও ড্রিবলিং। পরের বিশ্বকাপগুলোতে ধীরে ধীরে বেড়েছে মাঝমাঠে তাঁর প্রভাব, পাস দেওয়ার ক্ষমতা ও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব।
শেষ দিকে এসে মেসি আরও কম দৌড়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন মাঠে। একটি নিখুঁত পাস, সঠিক পজিশন কিংবা মুহূর্তের সিদ্ধান্ত দিয়েই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এই ৩৯ বছর বয়সেও ধরে রেখেছেন তিনি।
একজন তরুণ ড্রিবলার থেকে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণকারী প্লে-মেকার, ৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি'র যাত্রা তাই একই সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ার ও খেলার দর্শনের পরিবর্তনের গল্প।
