আশুলিয়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ছিলো প্রতিরোধযোগ্য; দায়ী ত্রুটিযুক্ত সিলিন্ডার : তদন্ত কমিটি
ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রিটি গ্রুপের কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে প্রতিরোধযোগ্য শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলা, ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যকে এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেছে কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিটি গ্রুপের মালিকানাধীন প্রিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভেতরে অবস্থিত প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের কারখানাটি আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। যান্ত্রিক ত্রুটির প্রতি অবহেলা, দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব দুর্ঘটনাটিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এর আগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও থানার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। এর আহ্বায়ক ছিলেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিটুস লরেন্স চিরান, যিনি সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হয়েছেন।
অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি
তদন্ত প্রতিবেদনের 'আইনগত ব্যত্যয়' অংশে বলা হয়েছে, প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের কারখানার লাইসেন্স ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট নবায়ন করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়। এর মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত। অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদে কারখানাটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স নবায়ন করে।
তবে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে উচ্চচাপের সিএনজি সিলিন্ডার পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়ম ছিল। অনুমোদনহীন বা অনুপযুক্ত যানবাহনে গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার পরিবহন, কাভার্ড ভ্যানে রাখা গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডারের সঙ্গে এলপিজি গ্যাসাধার একই স্থানে রাখা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলিন্ডারের পুনঃপরীক্ষা না করা এবং ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার ও ভালভ ব্যবহারকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো ও স্থানান্তরের সময় আঘাত লাগা এবং অনুমোদিত নকশা ও স্থাপনাব্যবস্থা ছাড়াই শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সিএনজি ব্যবহারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ধরনের পদার্থ সংরক্ষণের জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কারখানাটিতে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ও শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকার পাশাপাশি দাহ্য পদার্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ছিল। এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছিল এবং অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি আরও তীব্র হয়েছে।
সাত দফা সুপারিশ
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত দফা সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে, বিস্ফোরক লাইসেন্সবিহীন কাভার্ড ভ্যান ও লরিতে গ্যাসপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার পরিবহন ও সরবরাহ বন্ধ করা এবং অনুমোদনহীন সিলিন্ডারবাহী যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ না করতে দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সিএনজি ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট সব অনুমোদন ও লাইসেন্স যাচাই করার সুপারিশ করেছে কমিটি। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, তিতাস গ্যাস ও সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত যৌথ পরিদর্শনের কথা বলা হয়েছে।
কাভার্ড ভ্যানে একাধিক সিএনজি সিলিন্ডার পরিবহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সুপারিশও রয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া উচ্চচাপের সিএনজি সিলিন্ডার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার, চাপ, কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগের পার্থক্য সম্পর্কে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহনকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার করা সিলিন্ডার যথাযথ কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া পুনরায় ব্যবহার না করার সুপারিশ করেছে কমিটি। দুর্ঘটনাস্থল ও আশপাশে পড়ে থাকা গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি যেসব সিলিন্ডারের মেয়াদ শেষ, সেগুলো এবং ক্ষতিগ্রস্ত, ক্ষয়প্রাপ্ত বা পরীক্ষার ইতিহাস নেই, এমন সিলিন্ডার বাতিল করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের অন্যান্য সুপারিশে আবাসিক এলাকায় স্থাপিত শিল্পকারখানা স্থানান্তর, কারিগরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নজরদারি ও তদারকি জোরদার এবং শ্রমিক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কমিটির আহ্বায়ক লিটুস লরেন্স চিরান অন্যত্র বদলি হওয়ায় তার সঙ্গেও তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
-কেআর
