আইএমএফকে না, নাকি নতুন শর্তে হ্যাঁ?
অর্থমন্ত্রীর ‘প্রোগ্রাম বাতিল’ বক্তব্যের পরও ব্যাংককে আলোচনা, ঢাকায় আসছে আইএমএফ মিশন; ঋণের চেয়ে বড় প্রশ্ন শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি
আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এই বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল যোগ দিচ্ছে। কিন্তু তার ঠিক আগে ‘আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দিয়েছি’ - অর্থমন্ত্রীর এই এক বক্তব্যেই বাংলাদেশের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আইএমএফের শর্ত বাংলাদেশ মানবে না —এমন বার্তাও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আইএমএফের অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এই সাহসী রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের পুরোপুরি মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র চার মাস আগে, গত জুনে, বাংলাদেশ সরকার নতুন একটি আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। জুলাইয়ে আইএমএফ-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্য কাঠামো, ঋণের আকার ও সংস্কার নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে গেছে। সফর শেষে আইএমএফ স্পষ্ট করেছিলো, আলোচনা পরবর্তী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
এরপর ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অংশ নেওয়ার কথা। সভার পর বাংলাদেশে আবারও আইএমএফ-এর প্রতিনিধি দল আসার প্রস্তুতি রয়েছে।
তাহলে কি সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচি বাতিল করেছে? নাকি বাতিল বলতে অর্থমন্ত্রী পুরোনো কর্মসূচি এবং তার শর্তকে বোঝাচ্ছেন? বর্তমান তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তের চেয়ে নতুন কর্মসূচির শর্ত নিজের অনুকূলে আনার চেষ্টা করছে— এই ব্যাখ্যাই বেশি বাস্তবসম্মত।
কথায় ‘না’, কাজে আলোচনার প্রস্তুতি
২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও লেনদেনের ওপর চাপ বাড়ার পর বাংলাদেশ আইএমএফ-এর দ্বারস্থ হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। পরে এর আকার বাড়িয়ে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়।
এ পর্যন্ত ওই কর্মসূচির পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ষষ্ঠ কিস্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ সময় আটকে ছিলো। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার আলোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যেই পুরোনো কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে নতুন একটি কর্মসূচিতে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ৩ জুন আইএমএফ জানায়, বাংলাদেশ নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। এরপর জুলাইয়ে আইএমএফ-এর মিশন ঢাকায় এসে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে।
আইএমএফ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির আকার, কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কর্মসূচির দরজা তখনও খোলা ছিলো। এই প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর ‘প্রোগ্রাম ক্যান্সেল’ বক্তব্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যদি এটি নতুন কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা হয়, তাহলে জুনে করা আবেদন এবং জুলাইয়ে হওয়া আলোচনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো, তার ব্যাখ্যা সরকারের কাছ থেকেই আসতে হবে। আর যদি এটি পুরোনো কর্মসূচি বাতিল এবং তার শর্ত থেকে বেরিয়ে আসার বক্তব্য হয়, তাহলে সরকারের বর্তমান কার্যক্রমের সঙ্গে তা অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কেন আইএমএফের শর্ত নিয়ে আপত্তি?
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য আইএমএফ-এর সংস্কার চাওয়ার জায়গাগুলো দেখতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফ-এর আলোচনায় চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো- রাজস্ব আদায় বাড়ানো; ব্যাংক খাতের সংস্কার; ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এসবের কোনোটিই সরকারের জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
রাজস্ব বাড়াতে হলে করের আওতা বাড়াতে হবে। কর ছাড় কমাতে হবে। কর প্রশাসনে সংস্কার করতে হবে। অথচ নতুন সরকার ব্যবসা-বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কর সুবিধা দেওয়ার পথেই এগিয়েছে।
আবার ব্যাংক খাত সংস্কার করতে হলে দুর্বল ব্যাংক, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের প্রশ্নে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভর্তুকি কমাতে গেলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অর্থাৎ আইএমএফ-এর শর্তগুলো শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে ব্যবসা, বিনিয়োগ, ব্যাংক, জ্বালানি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজস্বে
নতুন কর্মসূচির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন দর-কষাকষি হতে পারে রাজস্ব নিয়ে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা অর্থনীতির আকারের তুলনায় কর আদায় অত্যন্ত কম। ফলে সরকারের হাতে উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবায় ব্যয় করার মতো নিজস্ব অর্থ সীমিত।
আইএমএফ-এর দৃষ্টিতে এ সমস্যার সমাধান ছাড়া অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো কঠিন। কিন্তু সরকারের জন্য সমস্যা হলো, একই সময়ে ব্যয় বাড়ছে।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সরকারি কর্মচারীদের বেতন, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন। অথচ সেই তুলনায় রাজস্ব বাড়ছে না।
ফলে সরকার যদি আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী দ্রুত রাজস্ব বাড়াতে চায়, তাহলে করের বোঝা বাড়ানোর ঝুঁকি আছে। আবার কর ছাড় দিয়ে ব্যবসা-বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করলে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। এই দ্বন্দ্বের সমাধানই হবে নতুন কর্মসূচির আলোচনায় সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
ব্যাংক খাতে কঠিন সংস্কার
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। আইএমএফও জুলাইয়ের পর্যালোচনায় ব্যাংকিং খাতে উচ্চমাত্রার চাপের কথা বলেছে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন কৌশলের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।
সরকারের জন্য এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গা। কারণ ব্যাংক খাত সংস্কারের অর্থ শুধু নিয়ম পরিবর্তন নয়। এর অর্থ হতে পারে দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, মূলধন পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পরিচালনায় পরিবর্তন।
এসব সিদ্ধান্ত যতটা অর্থনৈতিক, ততটাই রাজনৈতিক। ফলে নতুন কর্মসূচিতে আইএমএফ শুধু ‘সংস্কার করা হবে’ —এমন প্রতিশ্রুতি চাইবে না; কত দিনে, কীভাবে এবং কী ফল পাওয়া যাবে, তারও হিসাব চাইতে পারে।
ভর্তুকির বোঝা কতটা কমানো সম্ভব?
জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয়ও নতুন ঋণ আলোচনায় বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়।
সরকার ইতোমধ্যে তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর ফলে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ, গ্যাস ও এলএনজির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভর্তুকি কমানো হলে তার প্রভাব পড়বে উৎপাদন খরচ ও ভোক্তা পর্যায়ের দামে।
অন্যদিকে ভর্তুকি ধরে রাখলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে। এখানে সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও আইএমএফের অর্থনৈতিক যুক্তির মধ্যে সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
‘নিজের পায়ে দাঁড়ানো’ কতটা সম্ভব?
অর্থমন্ত্রী আইএমএফের ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহের কথা বলেছেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক লক্ষ্য। একটি অর্থনীতি যদি নিজস্ব পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট, কর রাজস্ব, রপ্তানি আয় ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে পারে, তাহলে বহুপাক্ষিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমান প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশ কি এখনই সেই জায়গায় পৌঁছেছে?
আইএমএফের অর্থের গুরুত্ব শুধু ঋণের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। একটি আইএমএফ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য ঋণদাতার কাছেও একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকেত হিসেবে কাজ করে। ফলে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে তার প্রভাব শুধু একটি ঋণের ওপর পড়বে না; বিশ্বব্যাংক, এডিবি কিংবা অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। এটাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব ঝুঁকি।
ব্যাংককের বৈঠকেই কি অবস্থান পরিষ্কার হবে?
আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। আইএমএফের ২০২৬ বার্ষিক সভার তথ্য বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর।
সভাটির গুরুত্ব এখানেই যে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেখানে নতুন কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ থাকবে। সরকার যদি সত্যিই নতুন ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে থাকে, তাহলে ব্যাংককে সেটির আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন দেখা যাওয়ার কথা।
আর যদি সরকার নতুন কর্মসূচি চায়, তবে আলোচনার মূল বিষয় হবে, কোন শর্তে বাংলাদেশ সেই ঋণ নেবে। অর্থাৎ ব্যাংককের বৈঠক শুধু ঋণের পরিমাণ নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি হবে সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন এবং আইএমএফের সংস্কার কাঠামোর মধ্যে সমঝোতার পরীক্ষা।
এরপর ঢাকায় আইএমএফ
ব্যাংককের সভার পর বাংলাদেশে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের আসার বিষয়টি এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ, কোনো কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেলে সাধারণত তার পরবর্তী পর্যায়ের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে নিয়মিত মিশন পরিচালনার প্রয়োজন থাকে না।
বাংলাদেশে নতুন করে মিশন এলে সেটি হবে শক্তিশালী ইঙ্গিত যে আলোচনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেই মিশনে রাজস্ব, ব্যাংকিং খাত, ভর্তুকি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং আগের কর্মসূচির অসম্পন্ন বিষয়গুলো সামনে আসবে।
সরকারের জন্য তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে আইএমএফের সংস্কার পরিকল্পনার কতটা সমন্বয় করা যায়।
আসল লড়াই টাকা নিয়ে নয়, শর্ত নিয়ে
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন প্রশ্নটি শুধু ‘আইএমএফের টাকা নেবে কি নেবে না’ এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী শর্তে আইএমএফের টাকা নেবে এবং সেই শর্ত কতটা নিজের মতো করে নিতে পারবে।
সরকার চাইছে সংস্কার হবে, কিন্তু ধাপে ধাপে। অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে। একসঙ্গে কর বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো কিংবা ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের বদলে সময় নিয়ে এগোতে চায় সরকার।
আইএমএফের অবস্থান অন্য জায়গায়, সংস্কার শুধু ঘোষণায় থাকলে হবে না, তার বাস্তব ফলও দেখতে হবে। এই দুই অবস্থানের মধ্যেই হবে মূল দর-কষাকষি।
ঋণ না নেওয়ার ঝুঁকি, ঋণ নেওয়ারও মূল্য
আইএমএফের ঋণ না নেওয়া নিজে কোনো ব্যর্থতা নয়। বরং কোনো দেশ যদি নিজস্ব রাজস্ব ও পুঁজিবাজারের সক্ষমতা দিয়ে অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে পারে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি শক্তিশালী অবস্থান। কিন্তু সেই সক্ষমতা তৈরি হওয়ার আগেই আইএমএফের অর্থ থেকে সরে গেলে প্রশ্ন উঠবে, বিকল্প অর্থের উৎস কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন, জ্বালানি আমদানি, বাজেট ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কম রাজস্ব আহরণ—সবকিছু মিলিয়ে সরকারের আর্থিক চাপ কম নয়।
অন্যদিকে আইএমএফের ঋণ নিলেও তার মূল্য আছে। সংস্কার করতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমাতে হবে, করের আওতা বাড়াতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থাৎ দুই পথেই মূল্য দিতে হবে। একদিকে আইএমএফের ঋণ নিলে শর্ত মানার চাপ, অন্যদিকে ঋণ না নিলে বিকল্প অর্থের উৎস তৈরির চাপ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু ঋণ দিয়ে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন আইএমএফ কর্মসূচি প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু ঋণ পাওয়ার জন্য নয়, দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই রাজস্ব, ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো, বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ না করে নতুন কর্মসূচির শর্ত নিয়ে কঠোর দর-কষাকষি করবে।
অর্থমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে জানাতে চাইছেন, বাংলাদেশ আর আগের মতো শর্ত মেনে ঋণ নেবে না। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা সরকারকে আলোচনার টেবিলেও রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি, আর তা হলো বাংলাদেশ কিছু সংস্কারে সম্মত হবে, কিন্তু সময়সীমা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে ছাড় চাইবে।
এ কারণেই আগামী কয়েক সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংককের বার্ষিক সভা, এরপর ঢাকায় আইএমএফ মিশন এবং চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির প্রশ্ন, এই তিনটি ধাপেই স্পষ্ট হবে অর্থমন্ত্রীর ‘প্রোগ্রাম ক্যানসেল’ আসলে আইএমএফকে বিদায় জানানোর ঘোষণা, নাকি পুরোনো শর্তকে বিদায় দিয়ে নতুন চুক্তিতে যাওয়ার কৌশল।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে একটাই, আইএমএফের টাকা ছাড়াই অর্থনীতি চালানোর সক্ষমতা কি বাস্তবে তৈরি হয়েছে, নাকি সেই সক্ষমতা তৈরির আগেই আইএমএফের দরজায় আবার ফিরতে হবে?
