কৃষ্ণসার হরিণ শিকার থেকে শুরু, ২৮ বছরে সালমান-বিশ্নোই বিরোধ যেভাবে ভয়াবহ রূপ নিলো
সংগৃহীত ছবি
মুম্বাইয়ের জুহুতে রবিবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের বিএমডব্লিউ গাড়ি লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়ে ৩ মোটরসাইকেল আরোহী। ফুটবল খেলা শেষে একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফিরছিলেন অভিনেতা। হামলায় তিনি অক্ষত থাকলেও গুলিবিদ্ধ হন গাড়িচালক ফিরদৌস এবং এক অটোরিকশা-চালক। গুলি চালিয়েই মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি বার্তা। সেখানে হামলার দায় স্বীকারের পাশাপাশি হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, "বলিউডে যারা সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবেন, তাঁদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।" বার্তাটিতে অনিল পণ্ডিত ও হারমান সান্ধুর নাম উল্লেখ করা হয়। এই ঘটনায় একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
এই হামলার পর আবারও সামনে এসেছে বলিউড সুপারস্টার সালমান খান ও লরেন্স বিশ্নোই গোষ্ঠীর প্রায় ৩ দশকের বিরোধ। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্ব এখন শুধু অভিনেতাকে হত্যার হুমকিতে সীমাবদ্ধ নেই, সালমানের সঙ্গে কাজ করা অন্য তারকাদেরও ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠছে। ২০২৪ সালে সালমানের বাড়ির বাইরে গুলিবর্ষণ, একই বছরের অক্টোবরে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকিকে হত্যা এবং সর্বশেষ টাইগার শ্রফকে ঘিরে গুলির ঘটনা- সালমান বনাম লরেন্স বিশ্নোই গ্যাংয়ের বিরোধ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ
সালমান খান ও লরেন্স বিশ্নোইয়ের বিরোধের সূত্রপাত ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে। তখন রাজস্থানের যোধপুরে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলছিলো। অভিযোগ ওঠে, কঙ্কানি গ্রামের কাছে দু'টি কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করা হয়েছে। এই ঘটনায় সালমান খানসহ কয়েকজন অভিনেতার নাম আসে।
কৃষ্ণসার হরিণ বিশ্নোই সম্প্রদায়ের কাছে বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ এই সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। হরিণ শিকারের অভিযোগ কেন্দ্র করে সালমানের প্রতি ক্ষোভের কথা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন লরেন্স বিশ্নোই। পরে সালমানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও জানায় তাঁর গোষ্ঠী।
এই ঘটনার সময় লরেন্সের বয়স ছিলো মাত্র ৫ বছর। ফলে ১৯৯৮ সালের ঘটনাটি তখন থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধ ছিলো এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। যদিও লরেন্স বিশ্নোই এই ঘটনাকে সালমানের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
আদালত চত্বরেই হত্যার হুমকি
বিরোধটি প্রকাশ্যে ভয়াবহ রূপ নেয় ২০১৮ সালে। যোধপুরে কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলায় আদালতে হাজিরের সময় লরেন্স বিশ্নোই সালমান খানকে হত্যার হুমকি দেন। তিনি বলেছিলেন, যোধপুরেই সালমানকে হত্যা করা হবে।
এই হুমকির মধ্য দিয়ে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ সরাসরি প্রাণনাশের হুমকিতে রূপ নেয়। এরপর কয়েক বছর ধরে সালমানকে লক্ষ্য করে একের পর এক হুমকির ঘটনা সামনে আসতে থাকে।
সেলিম খানের কাছে হুমকির চিঠি
২০২২ সালের জুনে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ব্যান্ডস্ট্যান্ড এলাকায় সালমানের বাবা সেলিম খানের বসার জায়গার কাছে একটি হুমকির চিঠি পাওয়া যায়। সকালে হাঁটতে বেরিয়ে নিয়মিত ওই এলাকায় বসতেন সেলিম খান। চিঠিতে সালমানকে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালার মতো পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
এই ঘটনার এক মাস আগে ২৯ মে পাঞ্জাবের মানসা জেলায় নিজের গাড়িতে থাকা অবস্থায় গুলিতে নিহত হন সিধু মুসেওয়ালা। তাঁর হত্যাকাণ্ডে লরেন্স বিশ্নোই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ফলে সালমানের বাবার কাছে পাওয়া চিঠিটি নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করে।
ই-মেইলে হত্যার হুমকি
২০২৩ সালের মার্চে সালমান খানের ম্যানেজারের কাছে একটি হুমকির ই-মেইল আসে। এতে অভিনেতাকে সরাসরি হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি লরেন্স বিশ্নোইয়ের নামও উল্লেখ করা হয়। ততো দিনে সালমানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ কয়েক দফায় সামনে আসে। চিঠি ও ই-মেইলের হুমকির পর সালমানের বাড়ির বাইরে সরাসরি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
সালমানের বাড়ির বাইরে গুলি
২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভোরে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালায়। ওই ভবনেই থাকেন সালমান খান। হামলার সময় অভিনেতা বাড়িতে ছিলেন, তবে তিনি আহত হননি।
ঘটনার পর মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা তদন্ত শুরু করে। পরে এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুলিশ লরেন্স বিশ্নোই, তাঁর ভাই আনমোল বিশ্নোই এবং গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। লরেন্স ও আনমোলকে পলাতক অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়।
হত্যা করা হয় বাবা সিদ্দিকিকে
সালমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী ও রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকি ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে গুলিতে নিহত হন। বান্দ্রায় ছেলে জিশান সিদ্দিকির কার্যালয়ের কাছে হামলাটি ঘটে। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সালমানের সঙ্গে সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় হত্যাকাণ্ডের পর অভিনেতার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।
টাইগার শ্রফকে ঘিরে হামলা, এবার লক্ষ্য সালমানের সহযোগীরাও?
রবিবার (১৮ অক্টোবর) গুলির ঘটনা বিরোধটিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুটবল খেলা শেষে টাইগার শ্রফ গাড়িতে করে ফেরার পথে মোটরসাইকেলে আসা ৩ ব্যক্তি হামলা চালায়। প্রাথমিক তথ্য ও ভিডিও বিশ্লেষণে জানা যায়, হামলাকারীদের মধ্যে দু'জন সরাসরি গুলিবর্ষণ করে। তৃতীয় ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষায় ছিলো।
টাইগার গুলিবিদ্ধ হননি। তাঁর গাড়িচালক হাতে গুলির আঘাত পান। ঘটনাস্থলের কাছে থাকা এক অটোরিকশা চালক আহত হন। হামলার পর টাইগারকে নিজেই গাড়ির চালকের আসনে বসে সেখান থেকে চলে যেতে দেখা যায়।
ঘটনার পর অনিল পণ্ডিত ও হারমান সান্ধুর নামে ছড়ানো একটি পোস্টে হামলার দায় স্বীকার করা হয়। সেখানে সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তায় সালমানকে লরেন্স বিশ্নোই ও বিশ্নোই সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়।
মুম্বাই পুলিশ এখন হামলাকারীদের পরিচয়, হামলার পরিকল্পনা এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও অডিও বার্তার সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি হামলার সঙ্গে বিশ্নোই গোষ্ঠীর যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
সালমানকে একঘরে করার কৌশল?
সালমানকে সরাসরি আক্রমণের পাশাপাশি তাঁর পেশাগত পরিমণ্ডলেও ভয় ছড়িয়ে দিয়ে অভিনেতাকে একঘরি করার চেষ্টা করছে বিশ্নোই গ্যাং। বিভিন্ন বিশ্লেষকরা এমনটাই দাবি করছেন।
অন্যদিকে, অপরাধী গোষ্ঠীর পরিচয় ব্যবহার করে ভয় ছড়ানো ও নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন অপরাধ জগত নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট মহলেরও ধারণা এমন।
১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া বিরোধ ২০১৮ সালে প্রকাশ্য হত্যার হুমকি, ২০২২ ও ২০২৩ সালে নতুন হুমকি এবং ২০২৪ সালে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ক্রমেই গুরুতর রূপ নিচ্ছে।
//আইই//
