রাজনীতিতে স্ল্যাং: এখনই বন্ধ হোক
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের একপক্ষ মনে করে, আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তরুণ প্রজন্ম যে অসীম সাহস ও আত্মত্যাগ দেখিয়েছে, তা পুরো বিশ্বকে বাকরুদ্ধ করেছিলো। গ্রাফিতির দেওয়াল চিত্র থেকে শুরু করে আন্দোলনের বার্তা—সবখানেই তরুণদের মেধা ও চেতনার ধার ফুটে উঠেছিলো। অন্যপক্ষ মনে করে, রক্তক্ষয়ী সেই পরিবর্তনের পর বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে তরুণদের একটি অংশের চর্চায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো রাজনীতির ভাষা হিসেবে ‘স্ল্যাং’ ও কুরুচিপূর্ণ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার। ডিজিটাল সংস্কৃতি ও ‘মিম’ রাজনীতির ফাঁদ ২৪-পরবর্তী তরুণদের রাজনৈতিক চর্চার বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
সচেতন মহলের পর্যবেক্ষণ বলছে, সামাজিক মিডিয়ায় ঝোঁক থাকা এই প্রজন্ম ডিজিটাল স্পেসে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে নীতি-যুক্তি কিংবা আদর্শিক বিতর্কের চেয়ে ‘স্ল্যাং’, ‘ট্রল’ ও ‘মিম’ সংস্কৃতিকে বেশি পছন্দ করছে। প্রতিপক্ষকে কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে যুক্তিতে পরাজিত করার চেয়ে তাকে একটি গালি বা কুরুচিপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করাকে তরুণদের একাংশ নিজেদের ‘বিপ্লবী রূপ’ বা ‘কুল’ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটু বাড়তি ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ কিংবা ক্ষণিকের উন্মাদনা পাওয়ার তাগিদে ভাষার ন্যূনতম শালীনতা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠছে এই প্রবণতা, আসলে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, না কি ভাষার অবক্ষয়? তরুণদের এই ভাষাগত আগ্রাসনের পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। একপক্ষ মনে করছে, বহু বছর ধরে চলে আসা প্রশাসনিক নিপীড়ন ও রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি শুনতে শুনতে তরুণদের ভেতরে যে তীব্র আক্রোশ ও ক্ষোভ জমেছিলো, গণ-অভ্যুত্থানের পর তা বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো বেরিয়ে এসেছে। তবে, সেই ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম যখন শুধুই কুরুচিপূর্ণ শব্দ চয়ন ও স্ল্যাং হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রূপ ছেড়ে সামাজিক অবক্ষয়ে রূপ নেয়।
আজকের রাজপথের কিংবা ভার্চুয়াল স্পেসের মিছিল-স্লোগানে যে অনায়াস অশালীন শব্দমালা শোনা যায়, তা অতীতে হয়তো তরুণ সমাজ গোপন আলোচনায় বা বন্ধু মহলেই সীমাবদ্ধ রাখতো। কিন্তু এখন তা জনসাধারণের সামনে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভাষা হিসেবে স্বাভাবিকতা পেয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু ভিন্নমতকে প্রতিহত করতে যদি অশ্লীল ভাষার আশ্রয়ে গালিগালাজ করা হয়, তবে তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তরুণরা যখন যুক্তির স্থান গালাগাল দিয়ে পূরণ করতে চায়, তখন বোঝা যায় তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইশতেহার বা ভবিষ্যৎ রূপরেখা নেই। সস্তা গালি সাময়িক উন্মাদনা ও হাততালি এনে দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই একজন স্থায়ী রাষ্ট্রনায়ক বা পরিপক্ব নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে না।
২৪-এর আন্দোলন ছিলো বৈষম্যবিরোধী সমাজ গঠনের। কিন্তু আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে গিয়ে যারা রাজনীতির মাঠকে স্ল্যাংয়ের আখড়ায় পরিণত করছেন, তারা আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্যের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। উত্তরণের পথ ২৪-এর চেতনা ছিলো রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও ব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু ভাষার সংস্কার না হলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার টেকসই হতে পারে না।
তরুণ নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে বা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় লাঞ্ছিত করার নাম রাজনীতি নয়। স্লোগানে গালাগালের বদলে যুক্তি, তথ্য ও নীতিনির্ধারণী বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে স্ল্যাং ও কুরুচিপূর্ণ কন্টেন্ট ব্যবহারকারীদের বাহবা না দিয়ে বরং দলমত নির্বিশেষে বয়কট করতে হবে। ২৪-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি হোক যুক্তি, মেধা ও সৌজন্যের। তরুণরা তাদের ভাষার শালীনতা ও আদর্শের শক্তির মাধ্যমে রাজনীতিকে আবার সেবার জায়গায় ফিরিয়ে আনুক—কুরুচির অন্ধকূপে নয়।
