অপ্রতিম হত্যা: নতুন যেসব তথ্য পাওয়া গেলো
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে মামলার আসামি তুহিন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দেওয়া সময়রেখা অনুযায়ী, শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল নয়টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনো জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা জানতেন না যে অপ্রতিম মারা গেছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার খবর তাদের কাছে পৌঁছায়।
তদন্তকারীরা বলছেন, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছিলেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত আটটার দিকে তিনি ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তখনো অন্যদের নাম বলতে চাইছিলেন না তুহিন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য, অন্যদের নাম প্রকাশ না করতে তিনি ‘ওয়াদাবদ্ধ’।
তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মুঠোফোনে বারবার ফোন আসছিলো। ফোন করছিলো অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোর। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। পরে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, আটকের সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। ওই কিশোরকে আটকের খবর পাওয়ার পর তুহিন আরেক কিশোরের নাম জানান। এরপর তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।
তার ফোনে ঘন ঘন আসতে থাকা কয়েকটি অস্বাভাবিক কলই হয়ে ওঠে তদন্তের মূল চাবিকাঠি। পুলিশ সেই কলগুলোর সূত্র ধরে এগোতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
নিজের ফোন নেয়নি কেন
ঘটনার আগে থেকেই নিজেদের অবস্থান আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিলো কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ১৫ বছর বয়সী কিশোর মুঠোফোন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখতো। ঘটনার দিন নিজের মুঠোফোন সঙ্গে নেয়নি সে। পরিবর্তে পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে বের হয়েছিলো।
তদন্তকারীদের ধারণা, মুঠোফোনের অবস্থান যাচাই করা হলে যাতে ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি ধরা না পড়ে, সেই জন্যই এমনটি করা হয়েছিলো। ওই কিশোরের বাবাকে ঘটনার পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। তার অনুপস্থিতির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
ফোন গেল তুহিনের বাড়িতে
হত্যার পর অপ্রতিমের আইফোনটি নিয়ে চলে যান তুহিন—এমনটাই বলছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও তুহিনের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ফোনটি তার বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ সদর দক্ষিণ মডেল থানার সানন্দার বাড়িতে গেলে তুহিনের মা শিরিনা আক্তার বিছানার তোশকের নিচ থেকে ফোনটি বের করে দেন।
তুহিনের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যার আগেই তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। তখন তার ছোট ভাই তুষারকে ফোনটি সাবধানে লুকিয়ে রাখতে বলেন।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তুহিন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় বয়সে কম কয়েকজনকে নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং একটি দল তৈরি করেছিলেন। একসময় অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা হয়েছিলো বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
সিসিটিভি ফুটেজ
পুলিশ সূত্র থেকে পাওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে সেই পাহাড়ের পথ ধরে এগোচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, নির্জন সেই জায়গায় পৌঁছানোর পর তাদের সাথে যোগ দেয় আরও দুই কিশোর।
শুক্রবার বিকাল তখন ঘনিয়ে আসছে, সময়টা আনুমানিক পাঁচটা থেকে ছয়টার মাঝামাঝি। নির্জনতার সুযোগ নিয়ে অপ্রতিমের হাত থেকে আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু নিজের জিনিস বাঁচাতে সচেষ্ট কিশোর অপ্রতিম আঁকড়ে ধরে সেটি, শুরু হয় চরম ধস্তাধস্তি।
প্রতিবাদের মুখে তুহিন পাশ থেকে একটি বাঁশের লাঠি তুলে নিয়ে আঘাত করে বসে অপ্রতিমের মাথায়। এরপর বাকিরাও একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়— একটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে মাটিতে। হত্যাকাণ্ডের পর ঠান্ডা মাথায় রক্তমাখা স্থানটিতে অপ্রতিমের নিথর দেহ ফেলে রেখে, কেবল সেই মোবাইলটি নিয়ে চম্পট দেয় ঘাতকের দলটি।
// ইমরান//
