রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের জেরেই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ধস
রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের সঙ্গে কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির (আইটিসিএল) ব্যবসায়িক চুক্তি ও বকেয়া পরিশোধ নিয়ে জটিলতার জেরে সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কম্পাস প্লাসের পাওনা পরিশোধ নিয়ে বিরোধের কারণে রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়। এতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকেরা হঠাৎ করে এটিএম, কার্ড ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন। রোববার রাত থেকে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন বন্ধ রয়েছে।
জানা যায়, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী স্থানীয় পেমেন্ট প্রসেসর ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আইটিসিএল) ও রুশ প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের মধ্যে সফটওয়্যার মাইগ্রেশন নিয়ে বিরোধ থেকে এ সংকটের সূত্রপাত।
আইটিসিএল জানায়, ব্রাসেলস-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনওয়ের তৈরি এন্টারপ্রাইজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম 'ওয়ে৪' দিয়ে তাদের প্ল্যাটফর্ম প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে, এমন খবর জানতে পেরে রুশ প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভারে একটি ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট বসিয়ে দেয়।
এই ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট প্রতি আট ঘণ্টা পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইটিসিএলের সার্ভারগুলোকে রিস্টার্ট করে দেয়। এর ফলে রাউটিং টেবিলগুলো মুছে যায় এবং পুরো নেটওয়ার্কজুড়ে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়।
আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী সাইফুদ্দিন মুনির সাংবাদিকদের জানান, 'সমস্যাটি চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে বিকাশসহ আমাদের সব অংশীদার ব্যাংককে সতর্ক করে দিই।'
আগস্টে আইটিসিএল ১২ থেকে ১৮ মাসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্মটি পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালে এই বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। অভিযোগ রয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় কম্পাস প্লাস কারিগরি সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১.৫ মিলিয়ন ডলার মাইগ্রেশন ফি দাবি করে বসে। সেইসঙ্গে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনযুক্ত আগাম পেমেন্ট গ্যারান্টিও দাবি করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া
এই অচলাবস্থা নিরসনে সোমবার ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও আইটিসিএলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টায় হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আইটিসিএল পূর্বঘোষণা ছাড়াই সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, 'এটা স্পষ্ট একটা কারিগরি সমস্যা, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এটা সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্ডধারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।'
আরিফ নিশ্চিত করেন, হঠাৎ সেবা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সদস্য ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের আগে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে জনসাধারণকে পর্যাপ্ত সময় আগে অবহিত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, আইটিসিএলের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ প্রথমে অক্টোবরের শেষের দিকে হওয়ার কথা ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, 'রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএল হঠাৎ করে আমাদের জানায়, তাদের জরুরি ভিত্তিতে সেবাটি অফলাইনে নিয়ে যেতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'তারা যদিও দাবি করেছে, জরুরি পরিস্থিতি তাদেরকে এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু পূর্বঘোষণা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো বন্ধ করে দেওয়া রেগুলেটরি কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।'
শিল্প ও গ্রাহক পর্যায়ে মারাত্মক প্রভাব
দেশের ৩৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রাথমিক পেমেন্ট প্রসেসিং ও গেটওয়ে অবকাঠামো সরবরাহ করে আইটিসিএল। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি), এটিএম, পয়েন্ট অভ সেল (পিওএস) টার্মিনাল, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফারের (আইবিএফটি) মতো মূল কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং-কার্ড লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশই আইটিসিএলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
আইটিসিএলের ওয়েবসাইটের এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহক রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও এটিএম বুথগুলোতে চরম বিপাকে পড়েন। তারা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ লেনদেন বা অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স পর্যন্ত চেক করতে পারছিলেন না।
হঠাৎ সেবা বন্ধ হওয়ার কারণে সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ায় সদস্য ব্যাংকগুলো তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মাহফুজুর রহমান বলেন, 'আইটিসিএল রোববার সন্ধ্যায় বিষয়টি আমাদের জানায়, ঠিক যেদিন তারা সেবাটি বন্ধ করে দেয়। গ্রাহকদের জানানোর জন্য আমাদেরকে একদিন সময়ও দেওয়া হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'সম্পূর্ণ অপেশাদার পদক্ষেপ ছিল এটি। এ পদক্ষেপ সব সদস্য ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করে দিয়েছে।'
- কেআর
/শান্ত/
