সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের ‘শর্তহীন’ প্রতিশ্রুতি: সামরিক প্রস্তুতি কতোটা?
সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবে কোনো ধরনের হামলা হলে ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত পাকিস্তান। দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এ কথা জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ইন্দোনেশিয়া'র জাকার্তায় আরব নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক এ অবস্থানের কথা জানান।
আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান কূটনৈতিক ও সামরিক দুইভাবেই রয়েছে। তিনি বলেন, ‘শারীরিক উপস্থিতির’ বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবকে রক্ষায় পাকিস্তান প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত।
পাকিস্তানের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পবিত্র নগরী বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) তায়েফে একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দু'জন আহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে ৮০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন-বিষয়ক সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, মক্কার সংরক্ষিত আকাশসীমার দিকে যাওয়া একটি হুথি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথিরা।
অন্যদিকে ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের ৩টি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি পথটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।
আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার ‘শর্তহীন’। দুই দেশের জনগণ এবং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও গভীর সম্পর্ক থেকেই এই অঙ্গীকার তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
সৌদি আরব ও ইসলামের পবিত্র দুই স্থান মক্কা ও মদিনা'র নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এ বিষয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ থাকা উচিত নয়। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাশে থাকবে।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্য গত সপ্তাহে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বক্তব্যের তুলনায় আরও স্পষ্ট ও কঠোর। এর আগে ইসলামাবাদ জানিয়েছিলো, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের ওপর হামলার জবাবে পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে তখন কোনো আলোচনা হচ্ছিলো না। তবে প্রয়োজন হলে ‘সময়মতো’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিলো।
গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ৩ দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে ৩ দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছিলো।
তবে দু'টি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সামরিক কার্যপ্রণালি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোনো দেশ আক্রান্ত হলে ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়েছে।
সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আরব নিউজ জানিয়েছে, গত মে মাসে ইসলামাবাদ প্রায় ৮ হাজার সেনা, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন, ড্রোন এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন করেছিলো।
এদিকে হুথি হামলার কারণে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ায় দেশটি পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও মিসরসহ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে বলে চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। তবে সর্বশেষ অনুরোধের পর কোনো দেশ অতিরিক্ত সামরিক সহায়তার বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
সৌদি আরব নতুন করে পাকিস্তানের কাছে আরও সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ চেয়েছে কি না, এ বিষয়ে আহমেদ শরিফ চৌধুরী কিছু জানাননি।
পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তার আওতায় পড়বে কি না, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। এ নিয়ে এর আগে পাকিস্তানের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।
সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতেও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইরানকে হুথিদের হামলা বন্ধে প্রভাব খাটানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
বুধবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। সে সময় আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও হুথিদের হামলার বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় এসেছিলো কি না, তা জানায়নি ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সৌদি আরবের নেতৃত্বের সঙ্গে এসব বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। একই সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের একটি আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে ইসলামাবাদ বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা আলোচনায়ও পাকিস্তান মধ্যস্থতা করেছিলো। এর ফল হিসেবে জুনে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ তৈরি হয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিরোধের সমাধানে একটি কাঠামো তৈরির কথা ছিলো ওই সমঝোতায়। তবে পরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় আলোচনা থেমে যায়।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র বলেন, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক একটি ঐকমত্যের দলিল এবং জটিল সামরিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটিই কার্যকর পথ হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে শিগগিরই আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানো সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা দেননি তিনি।
//আইই//
