৭৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস: নির্দেশনামূলক বিশ্ব প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের বিজ্ঞজনদের ভাষ্য দেশের প্রবীণরা ভালো নেই। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনকে বয়োজ্যেষ্ঠদের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে দেখা যায়। যথাযথ মানবিক দৃষ্টিতে তারা প্রবীণদের আদর করে না। অবজ্ঞা বিংবা লাঞ্ছনা যেন প্রবীণদের ভাগ্যলিপি। বাংলাদেশে বিরজমান এই প্রেক্ষাপটেই ৬ অক্টোবর উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ৭৬তম প্রবীণ দিবস। নিজস্ব নীতি আদর্শ বজায় রেখে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশ দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে পালন করে আসছে। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
দিবসটির গুরুত্ব, তাৎপর্য, সময় ও অধিক্ষেত্র বিবেচনা করে একটি সময়োপযোগী প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসটির জন্য একটি যথোপযুক্ত প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রতিপাদ্যটি হচ্ছে, ‘এইজ অব লংজিভিটি: রি থিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’। বাংলায় প্রতিবাদ্যটির মর্মার্থ দাঁড়ায়-দীর্ঘায়ু প্রাপ্তির এই যুগেও আয়ুষ্কাল আরও দীর্ঘতর করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিস্টেমগুলো সম্পর্কে আরও চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু ইতোমধ্যে আগের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বেড়েছে। এই অগ্রগতির ক্ষেত্রে জীবন যাপনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য কিছু সিস্টেম সামগ্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এরপরও সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা এই বছরের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্য ও বিশ্বের অন্য নির্দেশনার আলোকে আরও বাড়ানোসহ জোরদার করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক এবং রিজিওনাল সংগঠনসহ অনেকের পক্ষ থেকে। এই নির্দেশনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বয়োবৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসম্মত,উৎপাদনশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন জীবন ব্যবস্থা।
বিষয়গুলো শুধু বয়স্কদের বা বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গেই সম্পৃক্ত নয়; বরং স্থান-কাল-পাত্র-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দিবসটি পালন উপলক্ষে বয়স্কদের বা বৃদ্ধদের স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় সিস্টেমগুলোকে চারটি এরিয়ায় ভাগ করা যেতে পারে। যেমন, (১) সামাজিক সুরক্ষা; (২) স্বাস্থ্য ও যত্নাদি; (৩) শোভনীয় কাজ ও জীবনব্যাপী শিক্ষা; এবং (৪) সহায়ক পরিবেশ পরিস্থিতি।
উল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহভিত্তিক কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বৃদ্ধ ব্যক্তিগণ যেন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, সুস্বাস্থ্য ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণসহ অবদান রেখে বাঁচতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট কমিটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বয়স বৃদ্ধদের গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে চারটি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছে। যথা, (১) সকল প্রকার ও সকল মাত্রার দারিদ্র্য দূরীভূত করার কার্যকর পন্থা গ্রহণ; (২) অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিস্তৃত পরিসরের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা; (৩) বয়োবৃদ্ধ কালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়ার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রবণতাকে আরও জোরদার এবং স্বাস্থ্যসম্মত করা; (৪) বয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা যত্ন কাজটিকে একটি পেশার মর্যাদায় নিয়ে আসা। এই সেবাকে অর্থনীতির সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা। এই সেবা খাতকে আর্থিক বিনিয়োগের অন্যতম খাত হিসেবে গড়ে তোলা।
জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বিবেচনাপ্রসূত বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে। যেমন, এসকাপ এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য দিবসের প্রতিপাদ্য ভিত্তিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্সের আয়োজন করছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে আছে— (১) টেকনোলজি, (২) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং (৩) বয়োবৃদ্ধ জনসমাজ। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি থাকলেও বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জসমূহ। চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য,বৈষম্য, ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অনধিগম্ম্যতা ও বৈষম্যতা। এসবের জন্য দরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃতি। মনে রাখতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবারিত উত্থান ও দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর সরকারি সেবা পাওয়া এবং প্রদান উভয় ক্ষেত্রেই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। আবার এর মধ্য দিয়ে নতুন নতুন সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য এসব চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি মোকাবিলা করা খুবই জরুরি।
চলতি বছর দৈনিক যুগান্তরের ১ লা অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ষাটোর্ধ্ব জনগণের হার প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২২ সালে ছিলো ৯.২৮ শতাংশ। ২০২৬ সাল শেষে এই সংখ্যা ২ কোটিতে পৌঁছাবে। ২০৪১ সালে প্রবীণদের সংখ্যা ৩ কোটির বেশি এবং ২০৬১ সালে প্রায় ৬ কোটিতে দাঁড়াবে। অর্থাৎ চার দশক পর দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশের বেশি মানুষ প্রবীণ হয়ে পড়বে।
ESCAP-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে এই রিজিয়নে ৬০ এবং ৬০ ঊর্ধ্ব লোকের সংখ্যা ২০২০ সালে ছিলো মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৩.৬ ভাগ। এই হিসাবে আগামী ২০৫০ সালে এই হার দাঁড়াবে শতকরা ২৪ দশমিক ৯ ভাগ। একইসঙ্গে এসডিজি বা ২০৩০ সালের উন্নয়ন এজেন্ডা প্রসঙ্গে বলা যায়, এজেন্ডা যদি হয় প্ল্যান ফর পিপল, প্লানেট অ্যান্ড প্রসকারিটি জন্য। তাহলে এজেন্ডার কোনোটাতেই বৃদ্ধদের প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত না হওয়ার কোনো অবকাশই নেই। এছাড়া, এই জেন্ডার আদর্শের বাণীতে রয়েছে, ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড।’ সুতরাং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও দক্ষতা সম্পন্ন বয়োবৃদ্ধরা একইসঙ্গে এই উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের উপকারভোগী এবং অবদান রাখার যোগ্যতম ব্যক্তি।
বায়োবৃদ্ধদের সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু এতোটাই উদগ্রীব যে বৃদ্ধদের জীবন ব্যবস্থার তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়নের নিমিত্ত বিশ্বব্যাপী বিরাজমান সরকার, সিভিল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক এজেন্সি, পেশাদার, অ্যাকাডেমিক এবং প্রাইভেট সেক্টরকে এক কাতারে নিয়ে আসতে ২০২০ সালে ‘দ্য ডিকেড অব হেলদি’ শিরোনামে একটি কর্মসূচিরও সূত্রপাত করে। এই সূত্র ধরেই খোদ জাতিসংঘ ২০২০ সালের সাধারণ পরিষদের ৭৫ /১৩১ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করে ঘোষণা দেয় যে ‘২০২০২১- ২০৩০’ হবে the decade of healthy aging. জাতিসংঘ এই ডিকেভ বাস্তবায়নে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে।
সুতরাং ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসটি জাতিসংঘ ঘোষিত ডিকেডের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। আবার জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের রিজিওনাল সংগঠনগুলো সম্মিলিত হয়েই রিজিয়ন ভেদে কাস্টমাইজড সাপেক্ষে সাতটি কৌশলেরও ঘোষণা দেয়।
উল্লেখ, বয়োবৃদ্ধ সংক্রান্ত বিশ্ব নির্দেশনাকে উদ্দেশ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি ক্যাটাগরিতে ফেলা যেতে পারে। যেমন, (১)এনেবল ইন সোশ্যাল রিটার্ন; (২) সাপোর্ট এবং (৩) রিসার্চ, মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন।
এইক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তপূরণ অপরিহার্য । শর্তগুলো হচ্ছে: (১) সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি; (২) সক্ষমতা তৈরি ও যোগ্য নেতৃত্ব; (৩) স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য; কিন্তু সুবিন্যাসিত নীতি-পরিকল্পনা;(৪) বিভিন্ন সেক্টর ও স্টকহোল্ডার ভিত্তিক পরিকল্পনা; (৫) সাধারণ জনগণের ইতিবাচক ধারণা; (৬) কার্যকর সব পদ্ধতি এবং (৭) উপযুক্ত পরিমাণ আর্থিক ও মানবসম্পদদের সংস্থান।
এই অবস্থায় বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংগঠন, সিভিল সোসাইটির উচিত বিশ্ব গাইডগুলোর আলোকে নিজস্ব নীতি, নির্দেশনা, আদর্শ দর্শন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।
উল্লেখ্য, বয়স্কদের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা যদি কেবল বয়স্কদের ওপরে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে ঠিক হবে না; বরং বৃদ্ধদের নিয়েই বৃদ্ধদের জন্য যা করার তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে আজকে যারা বৃদ্ধ একসময় দেশ ও জাতির জন্য তারাই মেধা ও শ্রম দিয়েছেন এবং সুযোগ পেলে এখনো তারা তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। এই লক্ষ্যে অন্তত বৃদ্ধদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য বয়োবৃদ্ধদের কাজে লাগাতে হবে।
লেখক: সাবেক সচিব
