খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না আড়াই কোটি বাংলাদেশি
খাদ্য উৎপাদন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা সত্ত্বেও দেশের প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না। এতে নীতিগত সমন্বয়, অর্থায়ন এবং কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে বুধবার এক বিশেষজ্ঞ রাউন্ডটেবিল বৈঠকে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকায় 'অ্যাডভান্সিং নিউট্রিশন, হেলথ, অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক এই রাউন্ডটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (সিআইএমএমওয়াইটি)। দেশে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার উদ্ভাবনগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতিবিষয়ক একটি খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং ফুড ভ্যালু-চেইন সংগঠনের প্রায় ৪০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। ২০২২ সালের 'বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে' (বিডিএইচএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রতি চারজনের প্রায় একজন খর্বকায়, অন্যদিকে অর্ধেকেরও বেশি নারী পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে খাদ্যজনিত বিভিন্ন রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিআইএমএমওয়াইটির খসড়া প্রতিবেদনে ৪৯টি সক্রিয় জাতীয় উদ্যোগ পর্যালোচনা করা হয়—যার মধ্যে ২২টি খাদ্য নিরাপত্তা এবং ২৭টি পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ মূলত নীতিমালার অভাবে ভুগছে না। বরং ওভারল্যাপিং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, খণ্ডিত অর্থায়ন, দুর্বল সমন্বয় এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অসমান বাস্তবায়ন বিদ্যমান নীতিগুলোর প্রভাবকে সীমিত করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. ওয়ায়েস কবীর বলেন, 'বাংলাদেশে পুষ্টি খাতকে মূলধারায় আনা প্রয়োজন। নীতিগুলো তো রয়েছেই, তবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। সমন্বয়ের ঘাটতিগুলো অবশ্যই দূর করতে হবে।' সামর্থ্যই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম প্রধান জেসি উড বলেন, পুষ্টির উন্নতির ক্ষেত্রে খাবারের সামর্থ্য একটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদন ও দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, তবে শিশুদের অপুষ্টি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি এবং নিম্নমানের খাবার এখনো মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।' ডব্লিউএফপির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে জেসি উড জানান, দরিদ্র শহুরে পরিবার এবং কৃষক পরিবারসহ প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না। পুষ্টিকর খাবারকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে তিনি পুষ্টি-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা এবং শস্যের বাইরে গিয়ে কৃষি উৎপাদনে আরও বৈচিত্র্য আনার আহ্বান জানান। উড আরও উল্লেখ করেন, সরকারের নতুন পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষক-সহায়তা ব্যবস্থা একীভূত করার পরিকল্পনা একটি সুসংগঠিত পদ্ধতির সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে জাতীয় পুষ্টি পরিষদ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। সিআইএমএমওয়াইটির ইনোভেশন সিস্টেমস সায়েন্টিস্ট ড. রবি নন্দী বলেন, খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি খাদ্যভ্যাস উন্নত করার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, 'পরবর্তী পদক্ষেপ হলো নীতিগত প্রতিশ্রুতিগুলোকে সমন্বিত বিনিয়োগ ও স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত করা।' একই সঙ্গে তিনি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার এবং পুষ্টিসংক্রান্ত বাজেট ট্র্যাকিং ব্যবস্থার উন্নতির ওপর গুরুত্ব দেন। কৃষকদের ঝুঁকি সুরক্ষার প্রয়োজন বিশেষজ্ঞরা জানান, পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হলে কৃষক ও উৎপাদনকারীদের মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন ঝুঁকি নিরসন করা জরুরি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে চরম ঝুঁকির মুখোমুখি হন, অথচ উৎপাদন-পরবর্তী বৈচিত্র্যকরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা এখনো সীমিত। তিনি বলেন, 'কৃষি কাজ থেকে আয় বৃদ্ধি পাওয়া মানেই যে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া—তা নয়।' এজন্য তিনি উৎপাদন ও বাজারের ঝুঁকি কমানো এবং খামারের আয় ও পারিবারিক পুষ্টির মধ্যে সংযোগ জোরদার করার প্রক্রিয়া তৈরির আহ্বান জানান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আকরাম চৌধুরী বলেন, গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকাতেই পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা এখনো অপ্রতুল। ফলে জ্ঞান তৈরি ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সম্প্রদায় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা সাশ্রয়ী মূল্যের স্বাস্থ্যকর খাবার, বৈচিত্র্যময় উৎপাদন, খাদ্যের নিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেন। সিআইএমএমওয়াইটি জানিয়েছে, এই সুপারিশগুলো তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করবে, যা ভবিষ্যতে সরকার, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে নীতি সংলাপ, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে।